সুখী দম্পতিরাও পরকীয়ায় জড়ায়, বলছে গবেষণা

পরকীয়া নিয়ে সমাজে নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি কেবল মুহূর্তের আবেগ বা একটি ভুল সিদ্ধান্তের ফল। কিন্তু মনোবিজ্ঞানী ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরকীয়া একদিনে শুরু হয় না। বরং দীর্ঘদিনের মানসিক দূরত্ব, অপূর্ণ প্রত্যাশা, যোগাযোগের অভাব এবং সম্পর্কের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে একজন মানুষকে অন্য কারো প্রতি আবেগগতভাবে আকৃষ্ট করে তুলতে পারে।

‎গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পর্কে ভাঙন শুরু হওয়ার অনেক আগেই কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দেয়। যদি সেগুলো সময়মতো বোঝা যায় এবং সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তাহলে অনেক সম্পর্কই নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া সম্ভব।

যোগাযোগ কমে গেলে সতর্ক হোন
সুস্থ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো খোলামেলা যোগাযোগ। কিন্তু যখন স্বামী-স্ত্রী বা সঙ্গীর মধ্যে আগের মতো কথা হয় না, অনুভূতি ভাগাভাগি কমে যায় কিংবা প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও এড়িয়ে যাওয়া শুরু হয়, তখন মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। এই দূরত্বই পরবর্তীতে অন্য কারও সঙ্গে আবেগের সংযোগ তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে।

মানসিক চাহিদা অপূর্ণ থাকলে ঝুঁকি বাড়ে
শুধু আর্থিক নিরাপত্তা বা একসঙ্গে থাকা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে না। প্রত্যেক মানুষেরই ভালোবাসা, সম্মান, প্রশংসা, যত্ন এবং গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘদিন এসব চাহিদা পূরণ না হলে কেউ কেউ সেই স্বীকৃতি অন্য কোথাও খুঁজতে শুরু করেন। অনেক সময় পরকীয়ার শুরু হয় শারীরিক সম্পর্ক নয়, বরং মানসিক নির্ভরতা থেকে।

ছোট ছোট অভিমান জমে বড় সমস্যা হয়
সম্পর্কে মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অভিমান যদি দিনের পর দিন জমতে থাকে, ক্ষমা চাওয়ার বা ভুল বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা না থাকে, তাহলে সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যেতে থাকে। অমীমাংসিত ক্ষোভ মানুষকে ধীরে ধীরে সঙ্গীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

সুখী সম্পর্কেও কেন পরকীয়া হতে পারে
‎অনেকের ধারণা, শুধুই অসুখী দাম্পত্যে পরকীয়া ঘটে। বাস্তবে তা সবসময় সত্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরে থেকে সুখী মনে হওয়া সম্পর্কেও কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়তে পারেন। এর পেছনে থাকতে পারে নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আকর্ষণ, একঘেয়ে জীবন থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা, আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি, নিজের গুরুত্ব অনুভব করার চাহিদা কিংবা ব্যক্তিগত মানসিক সংকট।

বন্ধুত্ব থেকেই অনেক সময় শুরু হয়
‎মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বেশিরভাগ পরকীয়ার শুরু হয় নিরীহ বন্ধুত্ব দিয়ে। নিয়মিত কথা বলা, ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করা, একে অপরের মানসিক ভরসা হয়ে ওঠা-এসব ধীরে ধীরে আবেগের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এরপর সেই যোগাযোগ গোপন রাখা শুরু হলে সম্পর্কটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।কাউকে একপাক্ষিকভাবে দোষ দেওয়া ঠিক নয় পরকীয়ার প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ এক নয়। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক, পারিবারিক পরিবেশ এবং মানসিক অবস্থা ভিন্ন। তাই কোনো একটি ঘটনার ভিত্তিতে সব দায় একজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা দ্রুত বিচার করা সঠিক নয়। বরং সম্পর্কের সমস্যাগুলো বোঝা এবং সমাধানের পথ খোঁজাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

‎প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন
‎যদি একই সমস্যা বারবার ফিরে আসে, যোগাযোগ ভেঙে যায় বা সম্পর্ক নিয়ে দুজনই হতাশ বোধ করেন, তাহলে একজন মনোবিজ্ঞানী বা সম্পর্ক পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। এটি দুর্বলতার নয়, বরং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। পরকীয়া সাধারণত হঠাৎ ঘটে না, এটি অনেক সময় দীর্ঘদিনের মানসিক দূরত্ব, অপূর্ণ চাহিদা এবং যোগাযোগের ঘাটতির ফল। তবে প্রতিটি সম্পর্কের গল্প আলাদা। সময়মতো কথা বলা, একে অপরকে গুরুত্ব দেওয়া, বিশ্বাস বজায় রাখা এবং সমস্যা হলে তা নিয়ে আলোচনা করার অভ্যাস একটি সম্পর্ককে দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্থায়ী রাখতে সাহায্য করতে পারে। অনেক সময় একটি আন্তরিক কথোপকথনই ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পর্ককে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতে পারে।