জীবনের সব কষ্ট প্রকাশ না করে কিছু আকুতি শুধু আল্লাহকে বলুন

জীবনের প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো সময় দুঃখ, কষ্ট, দুশ্চিন্তা কিংবা কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। তবে জীবনের সব কষ্ট মানুষের কাছে প্রকাশ করা জরুরি নয়। অনেক সময় মানুষ আমাদের কথা শুনলেও আমাদের অনুভূতি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না, আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর সমাধানও দিতে পারে না। অথচ মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরের গভীরতম অনুভূতি, নীরব কান্না এবং অপ্রকাশিত বেদনারও পূর্ণ খবর রাখেন। তাই মন যখন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, তখন সর্বপ্রথম মানুষের পরিবর্তে আল্লাহর কাছেই সাহায্য ও প্রশান্তি কামনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতিটি অশ্রুবিন্দু, দীর্ঘশ্বাস এবং অন্তরের আর্তনাদ সম্পর্কে অবগত। মানুষের কাছে অজানা থাকলেও বান্দার কোনো কষ্টই আল্লাহর কাছে গোপন নয়। এ কারণেই দুঃসময়ে ধৈর্য ধারণ, দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখাকে একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনের একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রিয় সন্তান হজরত ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদে দীর্ঘ সময় কষ্ট ভোগ করলেও তিনি মানুষের কাছে অভিযোগ না করে একমাত্র আল্লাহর কাছেই নিজের দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

তিনি বললেন, আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৮৬)

ইসলামে ধৈর্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, যারা ধৈর্য ধারণ করবে তাদের জন্য রয়েছে সীমাহীন প্রতিদান। আল্লাহ তাআলা বলেন,

নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে পূর্ণরূপে প্রদান করা হবে।” (সুরা আয যুমার, আয়াত ১০)

একই সঙ্গে মুমিনের অন্যতম শক্তি হিসেবে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার কথা বলা হয়েছে। মানুষের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হলেও আল্লাহ এমন পথ খুলে দিতে সক্ষম, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে। এ বিষয়ে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,

আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সুরা আত তালাক, আয়াত ৩)

পবিত্র কোরআনে আরও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, কোনো কষ্টই স্থায়ী নয়। প্রতিটি কঠিন সময়ের পরই স্বস্তি ও সহজতা আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।” (সুরা আলাম নাশরাহ, আয়াত ৫ থেকে ৬)

হাদিসেও দুঃসময়ে ধৈর্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

মুমিনের অবস্থা সত্যিই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, এটি তার জন্য কল্যাণ। আর দুঃখ কষ্টে পড়লে সে ধৈর্য ধারণ করে, এটিও তার জন্য কল্যাণ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯)

ইসলামি শিক্ষায় বলা হয়েছে, সব কষ্ট মানুষের কাছে প্রকাশ করতে হয় না। এমন অনেক বেদনা রয়েছে, যা একমাত্র আল্লাহর কাছেই তুলে ধরা সবচেয়ে উত্তম ইবাদত। কারণ মানুষ ভুলে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহ কখনো বান্দাকে ভুলে যান না। তিনি নীরব কান্না শোনেন, গোপন দোয়া কবুল করেন এবং ধৈর্যশীল বান্দাদের প্রতিদান কখনোই বিফল করেন না।

তাই হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ, বেশি বেশি দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, মহান আল্লাহই মানুষের কষ্টকে শান্তিতে, অশ্রুকে হাসিতে এবং কঠিন পরীক্ষাকে সফলতায় রূপান্তরিত করার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। সেই সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কাছে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক কামনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।