বিশ্বশান্তির আহ্বানে নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন

মোঃ শাহজাহান বাশার

বিশ্বশান্তি, মানবিক মূল্যবোধ, আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশাল পিস কনফারেন্স-২০২৬’। শনিবার (২৫ জুলাই) নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের জালসা কনভেনশন হলে Sufis & Mainia Youth Forum-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল—‘Love and Mercy – The Message of All the Prophets (PBUH)’ (ভালোবাসা ও দয়া—সকল নবী-রাসুলের (আ.) বার্তা)।

সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত আলেম-ওলামা, সুফি ব্যক্তিত্ব, গবেষক, শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক, আন্তধর্মীয় নেতা, সমাজসেবী এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দিনব্যাপী আয়োজনে বিশ্বশান্তি, নৈতিকতা, ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবিক সহযোগিতা ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

সম্মেলনের প্রধান অতিথি ও মূল বক্তা ছিলেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক কেন্দ্র মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের পীর এবং ওয়ার্ল্ড অব সুফিজের প্রেসিডেন্ট ড. শাহ সূফী সায়্যিদ সাইফুদ্দীন আহমেদ আল হাসানী আল মাইজভাণ্ডারী (ম.জি.আ.)। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, বিদ্বেষ ও বিভাজনের পরিবর্তে ভালোবাসা, দয়া, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সময়ের অন্যতম প্রধান প্রয়োজন। তিনি বলেন, সব নবী-রাসুলের (আ.) শিক্ষা ছিল মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রজীবনে এসব মূল্যবোধের চর্চা বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্য বিভেদের কারণ নয়; বরং পারস্পরিক পরিচয়, সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি বিশ্বব্যাপী আন্তধর্মীয় সংলাপ জোরদার এবং মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন Ahmed Muhaiyudeen, Jonathan Granoff, Sayeed Mashooq Main Al Din Al Hasani, Shaykh Faisal Hamid Abdur-Razak, Sheikha Maryam Kabeer Faye, Allama Sayed Jubayer Ahmed (MJA), Azmain Asrar Maizbhandari, Qari Muhammad Farooq, নিউ জার্সির বিলাল মসজিদের ইমাম ও খতিব, Sayeed Hamza Shah, Mufti Sajjad Raza এবং আন্তধর্মীয় নেতা Michael Shevack।

বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, ইসলামসহ সব ঐশী ধর্মের মূল শিক্ষা শান্তি, ন্যায়, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবসেবা। বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় সহনশীলতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানবিক সহযোগিতা জোরদারের কোনো বিকল্প নেই। তাঁরা সহিংসতা, ঘৃণা ও বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ, সহযোগিতা এবং মানবকল্যাণভিত্তিক উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল্লামা সাইয়্যিদ মুতাওয়াক্কিল বিল্লাহ বাদরপুরী, গিয়াস আহমেদ, আলহাজ মোহাম্মদ সালিম উদ্দিন, মোহাম্মদ লুৎফুল করিম, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন আজাদ, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং মোশেরেফ হোসাইন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইসলামী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও সম্মেলনে অংশ নেন।

পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে হামদ ও নাত পরিবেশনের পর একাধিক অধিবেশনে বিশ্বশান্তি, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় নেতাদের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সম্মেলনের সমাপনী পর্বে ড. শাহ সূফী সায়্যিদ সাইফুদ্দীন আহমেদ আল হাসানী আল মাইজভাণ্ডারী বিশ্বশান্তি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের নিরাপত্তা এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। এ সময় বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, ঘৃণা, বৈষম্য ও বিভেদের অবসান এবং ভালোবাসা, দয়া ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়।

আয়োজকদের ভাষ্য, বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের এক মঞ্চে এনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংলাপ ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করাই এ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। তাঁদের আশা, এ ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী শান্তি, মানবিকতা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।