আর্থিক সংকট পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি, কক্সবাজারের নীলা ওয়ান রাখাইনের অনন্য সাফল্য

নিচে মূলধারার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসাকে সঙ্গী করে সাফল্যের নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন কক্সবাজারের মেধাবী শিক্ষার্থী নীলা ওয়ান রাখাইন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচ বছরের পূর্ণ অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে “টিচিং অ্যান্ড লার্নিং” বিষয়ে গবেষণার জন্য ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। আগামী ১ আগস্ট উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা দেবেন নীলা। নীলার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কক্সবাজারে। তাঁর বাবা মংফ্রুথেন রাখাইন একজন দরজি এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। সীমিত আয়ের পরিবারে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আগে কোনো কোচিং করার সুযোগ পাননি। তবুও নিজের চেষ্টায় প্রস্তুতি নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরও থেমে থাকেননি তিনি। পড়াশোনার খরচ চালাতে একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক দায়িত্বেও সহযোগিতা করেছেন। কর্মব্যস্ততার মাঝেও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় মানসিকতাই তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর নীলা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে স্নাতক সম্পন্ন করার পর শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে। শিক্ষকতা এবং শিক্ষা গবেষণার প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি পরবর্তীতে শিক্ষা উন্নয়নমূলক বিভিন্ন উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক সংগঠনে কাজ করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষক, অনলাইন শিক্ষাকর্মী এবং কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের বিভিন্ন শিক্ষা প্রকল্পে কাজ করার পাশাপাশি দেশের জনপ্রিয় অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম “১০ মিনিট স্কুল”-এ ইংরেজি প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “চালুং একাডেমি”। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাখাইন সম্প্রদায়ের শিশুদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত অবস্থায় নীলা বিয়ে করেন। তিনি জানান, উচ্চশিক্ষার পুরো যাত্রায় তাঁর স্বামী নি জ রাখাইন ছিলেন সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। যৌথ পরিবারে বসবাস করেও পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে স্বামীর সহযোগিতা এবং উৎসাহ তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পিএইচডির জন্য আবেদন করার পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি এবং কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ভর্তির সুযোগ পান নীলা। এর মধ্যে ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি এবং ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি তাঁকে পূর্ণ অর্থায়নের বৃত্তির প্রস্তাব দেয়। সবদিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নেন তিনি।

নীলা ওয়ান রাখাইন বলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও তাঁর লক্ষ্য বাংলাদেশেই ফিরে আসা। গবেষণা ও অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজে লাগাতে চান তিনি। বিশেষ করে আদিবাসী শিক্ষার্থী এবং মেয়েদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। প্রতিকূলতা, দারিদ্র্য এবং সীমিত সুযোগকে জয় করে নীলা ওয়ান রাখাইনের এই সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, কক্সবাজারসহ দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর জন্যও এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।