সাংবাদিকতা থেকে পর্নো ইন্ডাস্ট্রি, সেখান থেকে রাজনীতি, কলম্বিয়ার সিনেটর হয়ে আলোচনায় দেইসি ওমানা

সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু। এরপর সেই পেশা ছেড়ে যোগ দেন প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে। সেখানে অর্জন করেন ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা। কিন্তু সেই পরিচিতির গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বেছে নেন রাজনীতির পথ। নানা সমালোচনা, বিতর্ক ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যান দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার সিনেটর।

বলছিলাম কলম্বিয়ার বামপন্থি রাজনীতিবিদ দেইসি আলেজান্দা ওমানা অর্টিজের কথা। সম্প্রতি দেশটির সিনেটর হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই জীবনের একাধিক ভিন্নধর্মী অধ্যায় পেরিয়ে তিনি কলম্বিয়ার জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন। স্থানীয় সময় ২৭ জুলাই রাজধানী বোগোতায় বামপন্থি রাজনৈতিক জোট হিস্টোরিক প্যাক্ট ফর কলম্বিয়ার (Historic Pact for Colombia) প্রতিনিধি হিসেবে সিনেটর পদে শপথ নেন দেইসি। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি কলম্বিয়ার নর্তে দে সান্তান্দার অঞ্চল থেকে সিনেটর নির্বাচিত হন।

দেইসির কর্মজীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। তবে ২০১৭ সালে তিনি সেই পেশা ছেড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে যোগ দেন। সেখানে তিনি ‘আমারান্তা হাঙ্ক’ (Amaranta Hank) নামে পরিচিতি লাভ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এ শিল্পে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও প্রায় দুই বছর পর তিনি সবকিছু ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর দেইসি নিজেকে সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। বর্তমানে তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে কাজ করছেন। একই সঙ্গে মানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দেইসির মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কর্মরত ব্যক্তিরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এজেন্সির শোষণের শিকার হন। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং কর্মপরিবেশকে নীতিমালার আওতায় আনতে আইনি কাঠামো প্রয়োজন। সিনেটর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় প্রকাশিত এক প্রচারণা ভিডিওতে তিনি বলেন, ভুয়া তথ্য, কুসংস্কার এবং সামাজিক দ্বিচারিতার কারণে রাষ্ট্র এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতকে আইনি ও নীতিগত কাঠামোর আওতায় আনার জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে তার রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। সিনেটর পদে প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে। সমালোচকদের দাবি ছিল, প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্প থেকে আসা কোনো ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত নয়।

এসব সমালোচনার জবাবে দেইসি বলেন, শুধুমাত্র অতীত পেশার কারণে কাউকে জনসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করা নারীরা কেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো পদে দায়িত্ব পালনের স্বপ্ন দেখতে পারবেন না নিজের বক্তব্যের পক্ষে তিনি ইতালির সাবেক আইনপ্রণেতা ইলোনা স্টালারের উদাহরণও তুলে ধরেন। ইলোনা একসময় পর্নো তারকা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে রেডিও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ইতালির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নিজের জীবন অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে দেইসি বলেন, বৈষম্য, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম এবং প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তার। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে রাজনীতিতে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

তার ভাষায়, “আমার অভিজ্ঞতা আমাকে বৈষম্য, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম এবং প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে সহায়তা করেছে। আমি এসব বিষয় সরাসরি সংসদে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। সমস্যা হলো, সমাজ প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করা মানুষের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও ক্ষমতার জায়গায় তাদের প্রতিনিধিত্ব মেনে নিতে চায় না।সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেইসি ওমানা এখন সামাজিক বৈষম্য দূর করা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক উত্থান কলম্বিয়াসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।