আইন, রাজনীতি ও ন্যায়বোধের এক অধ্যায় অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু: জীবন, কর্ম ও আদর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
কুমিল্লার রাজনীতি ও আইনাঙ্গনে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন মরহুম অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু। আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী—বহুমাত্রিক পরিচয়ে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনগত ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কুমিল্লার রাজনীতি ও আইনাঙ্গনের একটি পরিচিত অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন, আইন পেশায় অবদান এবং আইনমন্ত্রী হিসেবে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এখনো দেশের রাজনৈতিক ও আইনগত ইতিহাসে আলোচিত।

আবদুল মতিন খসরু ১৯৫০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন কুমিল্লা জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন। কৈশোরেই রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। জীবনীভিত্তিক বিভিন্ন সূত্রে ১৯৬৬ সালে ছাত্রলীগের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ রয়েছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন অবিভক্ত বুড়িচং থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

স্বাধীনতার পর আইন পেশাকে নিজের প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন মতিন খসরু। ১৯৭৮ সালে কুমিল্লা জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় যুক্ত হন।

দীর্ঘ আইন পেশায় তিনি আদালত ও আইনজীবী সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

জাতীয় রাজনীতিতে মতিন খসরুর বড় পরিচয় তৈরি হয় কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা ছিল। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় সংসদ—দুই ক্ষেত্রেই তিনি দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আবদুল মতিন খসরু আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

আইনমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ১৯৭৫ সালের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ। এর ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আইনি পথ তৈরি হয়।

১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত, সহজ, কম ব্যয়বহুল ও সহজলভ্য বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। ইনডেমনিটি বাতিলের বিষয়টিকেও তিনি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

জাতীয় সংসদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মতিন খসরু। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দলের কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৭ সালে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন বলে বিভিন্ন জীবনীভিত্তিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

জীবনের শেষ পর্যায়েও আইনাঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০২১ সালের মার্চে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২১-২০২২ মেয়াদে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।

মতিন খসরুর দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে তাকালে তাঁর পরিচয়ের কয়েকটি দিক বিশেষভাবে সামনে আসে—মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা, দীর্ঘ আইনজীবী জীবন, কুমিল্লা-৫ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং আইনজীবীদের সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়া।

বিশেষ করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ তাঁর রাজনৈতিক ও আইনগত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও সুলভ বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কুমিল্লার রাজনীতি ও আইনাঙ্গনের দীর্ঘ এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তবে তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনগত ইতিহাসে এখনো আলোচনার বিষয়।

মতিন খসরুর জীবন ছিল আইন পেশা, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে ঘিরে দীর্ঘ পথচলার এক সমন্বিত অধ্যায়। মানুষের অধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য অবস্থানই তাঁকে তাঁর কর্মজীবনের বাইরে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।

মানুষের জীবন শেষ হয়, কিন্তু কিছু কর্ম ও সিদ্ধান্ত সময়ের সঙ্গে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। আবদুল মতিন খসরুর জীবন ও কর্মও তেমনই একটি অধ্যায়।

মরহুম অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
আল্লাহ তাঁকে মাফ করে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

আরও খবর

আজ যেসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে

দৈনিক জয়যাত্রার কুমিল্লা জেলা বিশেষ প্রতিনিধি হলেন সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার

এডিএম স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ বিশেষ অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা পেলেন কুমিল্লার কৃতী সন্তান অ্যাডভোকেট মো. হাবিবুল হক

চার গুণীজনকে সম্মাননা, স্মার্ট অ্যাওয়ার্ড পেলেন অ্যাডভোকেট হাবিবুল হক

হযরত গাউসুল আজম বাবা ভাণ্ডারীর (ক.) ১৬৪তম খোশরোজ শরিফ আখেরি মোনাজাতে সম্পন্ন – বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণে বাবাভাণ্ডারীর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান শাহসুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারীর

ব্যক্তিগত সংগ্রাম থেকে ন্যায়ের অঙ্গীকার: আইনজীবী কুমিল্লার কৃতী সন্তান জনাব মো. হাবিবুল হক

আরও খবর: অন্যান্য

আজ যেসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে

দৈনিক জয়যাত্রার কুমিল্লা জেলা বিশেষ প্রতিনিধি হলেন সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার

এডিএম স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ বিশেষ অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা পেলেন কুমিল্লার কৃতী সন্তান অ্যাডভোকেট মো. হাবিবুল হক

চার গুণীজনকে সম্মাননা, স্মার্ট অ্যাওয়ার্ড পেলেন অ্যাডভোকেট হাবিবুল হক

হযরত গাউসুল আজম বাবা ভাণ্ডারীর (ক.) ১৬৪তম খোশরোজ শরিফ আখেরি মোনাজাতে সম্পন্ন – বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণে বাবাভাণ্ডারীর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান শাহসুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারীর

ব্যক্তিগত সংগ্রাম থেকে ন্যায়ের অঙ্গীকার: আইনজীবী কুমিল্লার কৃতী সন্তান জনাব মো. হাবিবুল হক