মোঃ শাহজাহান বাশার
নিজে স্বপ্ন দেখেন, অন্যকেও স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন—এমন মানুষের সংখ্যা সমাজে খুব বেশি নয়। আর সেই স্বপ্ন যদি নিজের জন্য না হয়ে হয় হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য, তাহলে সেই মানুষ হয়ে ওঠেন অনন্য। তেমনই এক স্বপ্নবান ও শিক্ষানুরাগী মানুষ মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল—কীভাবে ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া যায়। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, আর্থিক সংকট কিংবা প্রবাসজীবনের কঠোর সংগ্রাম কোনো কিছুই তাঁকে সেই স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং আমেরিকার মাটিতে শ্রম দিয়ে উপার্জিত অর্থ দেশে এনে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামে জন্ম নেওয়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন যেন এক রূপকথার গল্প। উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েই জীবিকার সন্ধানে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। পরিবারের ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। অথচ সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও শিক্ষা ও মানুষের কল্যাণের প্রতি তাঁর যে গভীর অনুরাগ তৈরি হয়েছিল, তা আজও তাঁকে পথ দেখাচ্ছে।
১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মাৎ আশেদা খাতুন চৌধুরী দম্পতির ঘরে প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়, ১৯৭৪ সালে, তিনি হারান তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরীকে। ছয় সন্তানকে বুকে নিয়ে মায়ের সংগ্রামী পথচলা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। চাচাদের সহযোগিতায় কোনোভাবে চলতে থাকে পরিবার। শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে জীবনের কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে যেমন শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও তৈরি করেছে।
১৯৮৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তিনি কাতারে পাড়ি জমান। পরবর্তী সময়ে আমেরিকায় গিয়ে শুরু করেন নতুন সংগ্রাম। নিউইয়র্কে ট্যাক্সিক্যাব চালিয়েছেন, কখনো ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেছেন, আবার কখনো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটাই—কোনোভাবে দিন কাটিয়ে অর্থ সঞ্চয় করা এবং সেই অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। বিদেশের মাটিতে নিজের ঘাম ঝরিয়ে অর্জিত অর্থ তিনি ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে ব্যয় না করে জন্মভূমির মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে বিনিয়োগ করেছেন।
১৯৮৯ সালে দেশে ফিরে ধান্যদৌল গ্রামে নিজের বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এরপর ১৯৯৪ সালে তাঁর মা ও দাদির নামে প্রতিষ্ঠা করেন আশেদা-জোবেদা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। শিক্ষার প্রসারে তাঁর এই উদ্যোগ এখানেই থেমে থাকেনি।
১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। বর্তমানে সেখানে ১০টি বিষয়ে অনার্স পড়ানো হচ্ছে এবং প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। একই বছর উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। বর্তমানে সেখানে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে। নারীদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণেও তাঁর এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এরপর ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মুমু রোহান কিন্ডার গার্টেন। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
একজন মানুষের জীবনে এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগই নয়, রয়েছে পারিবারিক শিক্ষাদর্শ ও ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর শিক্ষানুরাগের অনুপ্রেরণা এসেছে তাঁর বাবা ও বাবার দাদার কাছ থেকে। ১৯৩৭ সালে তাঁর বাবার দাদা মরহুম সিরাজ খান চৌধুরী নিজ গ্রামে ধান্যদৌল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিজেই সেখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। আবার ১৯৫৭ সালে তাঁর বাবা মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী রাঙামাটির মতো দুর্গম এলাকায় শিক্ষার আলো জ্বালাতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের এলাকা থেকে শিক্ষক নিয়ে গিয়ে সেখানে চাকরির ব্যবস্থাও করেন তিনি।
পারিবারিক সেই শিক্ষাসেবার ধারাবাহিকতাই যেন আরও বিস্তৃত হয়েছে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর হাত ধরে। তাঁর কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করাই শেষ কথা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে আর্থিক সংকটে পড়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে না চলে, সেটিও ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণে অর্থ উপার্জনের জন্য বারবার বিদেশে ছুটে গেলেও তাঁর মন পড়ে থাকত নিজের হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। প্রবাসে থেকেও নিয়মিত তদারকি করেছেন, খোঁজখবর রেখেছেন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করেছেন।
তাঁর প্রচেষ্টা ও সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় এসেছে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কুমিল্লা বোর্ডের সেরা ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল বলে জানা যায়। ২০১৭ সালে কলেজটির উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজে পাসের হার ছিল ৯৮ শতাংশ এবং আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ে পাসের হার ছিল ৮৬ শতাংশ।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাতেও রয়েছে তাঁর অবদান। ২০১০ সালে ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণে তিনি এক বিঘা জমি দান করেন। দরিদ্র মানুষের সহায়তা, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজেও তিনি সহযোগিতা করে আসছেন।
তাঁর মানবিকতার আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এলাকার একটি শতবর্ষী বটগাছ। ব্রাহ্মণপাড়া মন্দিরের পাশে থাকা এলাকার প্রাচীন ও বিশাল এই গাছটি একসময় বিক্রি হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়লে গাছটি রক্ষায় এগিয়ে আসেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। প্রায় এক লাখ টাকা দিয়ে গাছটি কিনে তিনি মন্দির ও গ্রামের স্কুলের নামে এর স্বত্ব দিয়ে দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—এলাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা এই প্রাচীন বৃক্ষটি যেন প্রাকৃতিকভাবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টিকে থাকে।
পৈতৃকভাবে সম্পদশালী পরিবারে জন্ম হলেও নিজের উপার্জনের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। চাইলে ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের জীবন বেছে নিতে পারতেন। ঢাকায় একাধিক বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা বিলাসী জীবন—সবই হয়তো তাঁর নাগালের মধ্যে ছিল। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবনদর্শন। স্ত্রী-সন্তানদের দেশে রেখে দীর্ঘ সময় বিদেশের মাটিতে মেসের সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন এবং সেই অর্থের বড় অংশ ব্যয় করেছেন এলাকার শিক্ষা ও মানবকল্যাণে।
নিজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বলেন, “মূলত বাবার স্কুল গড়ার স্বপ্নকে আমি একে একে বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছি।”
অন্যদের মতো পারিবারিক ভোগ-বিলাসে জীবন না কাটিয়ে কেন তিনি মানুষের জন্য এত কিছু করেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তাঁর বক্তব্যও অত্যন্ত সরল ও বিনয়ী। তিনি বলেন, “সবাই দান করতে পারেন না। আল্লাহ যার পক্ষে থাকেন, প্রকৃতিও তার পক্ষে থাকে। তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন, তাই এত কিছু করতে সক্ষম হয়েছি।”
ত্যাগের প্রসঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু ও মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ টেনে বলেন, এমন ত্যাগ শুধু একজনের পক্ষে সম্ভব নয়; সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে কাউকে না কাউকে ত্যাগ করতেই হয়। তাঁর দর্শন—আজ যদি কেউ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের জন্য কিছু না করেন, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে গড়ে উঠবে?
জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী—এমন প্রশ্নের জবাবেও ব্যক্তিগত সম্পদ কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠার কথা বলেননি তিনি। হাস্যোজ্জ্বল মুখে তাঁর সরল উত্তর, “প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা আরও কীভাবে মানসম্মত করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করা।”
অর্থাৎ জীবনের শুরুতে যে স্বপ্ন তাঁকে তাড়িত করেছিল, আজও সেই স্বপ্নই তাঁর পথচলার মূল শক্তি। ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন থেকে শুরু করে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা—মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর এই পথচলা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতার গল্প, ত্যাগের গল্প এবং মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছার গল্প।
এলাকাবাসী তাঁকে স্মরণ করেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং সেই শতবর্ষী বটগাছ রক্ষার উদ্যোগের কারণে। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তিনি নিজেই তৈরি করেছেন—একজন মানুষ হিসেবে, যিনি নিজের সাফল্যের আলো নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি; বরং সেই আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন অন্যের জীবনেও।
একজন মানুষের উপার্জিত অর্থ শেষ হয়ে যেতে পারে, সম্পদ একদিন অন্যের হয়ে যেতে পারে, কিন্তু শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করা একটি জীবন কখনো বৃথা যায় না। কারণ একটি শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি হলে তার সুফল ছড়িয়ে পড়ে পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে, আর রাষ্ট্র থেকে বিশ্বে।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন তাই আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়—সফলতার প্রকৃত অর্থ কি শুধু নিজের জন্য অর্জন, নাকি নিজের অর্জন দিয়ে অন্যের ভবিষ্যৎ তৈরি করা?
তাঁর জীবন সেই প্রশ্নের একটি জীবন্ত উত্তর।
তিনি নিজে স্বপ্ন দেখেছেন, অন্যদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজের জীবন ও উপার্জন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন তাঁর সেই স্বপ্নেরই একেকটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু মানুষের জন্য করা কাজ থেকে যায়। আর সেই কাজ যদি আলোকিত করে হাজারো মানুষের জীবন, তবে সেই মানুষ বেঁচে থাকেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিতে।
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এই নিরলস যাত্রায় মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী তাই শুধু একজন প্রতিষ্ঠাতা নন—তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, শিক্ষানুরাগী এবং মানবসেবার এক অনুপ্রেরণামূলক প্রতিচ্ছবি।